বাংলাদেশ চিনি শিল্প করপোরেশন (বিএসএফআইসি) কর্তৃক উৎপাদিত সাত ধরনের পণ্যের মধ্যে শুধু স্পিরিট-অ্যালকোহলেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হচ্ছে। এছাড়া ফরেন লিকারের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছি হলেও চিনি, চিটাগুড়সহ অন্যান্য পণ্যে এখনো পিছিয়ে রয়েছে সংস্থাটি। চাহিদা থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিনের পুরনো কারখানার সক্ষমতা দিন দিন কমতে থাকায় ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বিএসএফআইসি।
২০২৩-২৪ মৌসুমের উৎপাদন প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ সময় চিনি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪৫ হাজার ১০ টন। কিন্তু মৌসুম শেষে নয়টি মিলে মোট উৎপাদন হয়েছে ৩০ হাজার ৮১৮ টন, যা লক্ষ্যমাত্রার ৬৮ দশমিক ৪৭ শতাংশ। যদিও এ সময়ে স্পিরিট-অ্যালকোহলের লক্ষ্যমাত্রা ৬০ লাখ প্রুফ লিটারের মধ্যে উৎপাদন হয়েছে ৬০ লাখ ২৯ হাজার প্রুফ লিটার। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ফরেন লিকার। সর্বশেষ মৌসুমে এ পণ্যের উৎপাদন ২ লাখ ৩৩ হাজার কেস, যা লক্ষ্যমাত্রার ৯৩ দশমিক ২০ শতাংশ। অন্যদিকে চিটাগুড় লক্ষ্যমাত্রার ৮৭ দশমিক ৪১ শতাংশ, জৈবসার ৭৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ, চিনি ৬৮ দশমিক ৪৭ শতাংশ এবং ভিনেগার ৬৩ দশমিক ১১ শতাংশ উৎপাদন হয়েছে।
জানা গেছে, বিএসএফআইসির মূল পণ্য চিনি হলেও কাঁচামালের পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার নিশ্চিত করে অধিক লাভের জন্য প্রতিষ্ঠানটি নানামুখী পণ্য উৎপাদন করে থাকে। এক সময় ১৫টি চিনিকলের বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ছিল ২ লাখ ১০ হাজার ৪৪০ টন। কয়েক দশক আগেও এসব প্রতিষ্ঠানে সক্ষমতার চেয়ে বেশি চিনি উৎপাদন হতো। কিন্তু ৩০-এর দশকে যাত্রা করা চিনি শিল্প করপোরেশনের আওতাধীন অধিকাংশ চিনিকলের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে গেছে। তাছাড়া নিয়মিত সংস্কারে অভাব ও আখ সরবরাহে ঘাটতির কারণে ক্রমেই মূল পণ্য উৎপাদন থেকে ছিটকে পড়ছে বিএসএফআইসি। এদিকে ২০২০-২১ মৌসুম থেকে পঞ্চগড়, সেতাবগঞ্জ, রংপুর, শ্যামপুর, কুষ্টিয়া ও পাবনা চিনিকলের উৎপাদন বন্ধ রাখে শিল্প মন্ত্রণালয়। এর ফলে বছরে প্রায় এক লাখ থেকে মাত্র ২০-২২ হাজার টনে নেমে আসে চিনির উৎপাদন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে আখের কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন না হওয়া ও কারখানার উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় বিকল্প পণ্য উৎপাদন বাড়াচ্ছে বিএসএফআইসি। প্রতি কেজি চিনি উৎপাদন খরচের চেয়ে অর্ধেক দামে বিক্রি হওয়ায় বিপুল অংকের লোকসান গুনতে হয়। কিন্তু অ্যালকোহল, ফরেন লিকার, স্পিরিটসহ অন্যান্য পণ্য উৎপাদন খরচের চেয়েও বেশি দামে বিক্রির মাধ্যমে লাভবান হওয়া যায়। এ কারণে চিনির বিকল্প হিসেবে এসব পণ্যের দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে বিএসএফআইসি।
তথ্যমতে, বিএসএফআইসির নিয়ন্ত্রণাধীন কেরু অ্যান্ড কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেড ও রেনউইক যজ্ঞেশ্বর অ্যান্ড কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেডে চিনি-বহির্ভূত পণ্য উৎপাদন করা হয়। এর মধ্যে কেরু অ্যান্ড কোম্পানিতে ফরেন লিকার, স্পিরিট ও অ্যালকোহলের পাশাপাশি চিনিও উৎপাদন করা হয়। যদিও পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত রেনউইক যজ্ঞেশ্বর কোম্পানিতে শুধু কারিগরি ও প্রকৌশল পণ্য উৎপাদন করা হয়। বিএসএফআইসির প্রায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠান লোকসানে থাকলেও কেরু অ্যান্ড কোম্পানি ধারাবাহিকভাবে মুনাফার ধারায় রয়েছে।
বিএসএফআইসির সচিব মোহাম্মদ মুজিবুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চিনিকলগুলো দীর্ঘদিনের পুরনো হওয়ায় কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় উৎপাদন হচ্ছে না। আবার আখচাষ কমে যাওয়ায় সরবরাহ সংকটে কয়েক বছর ধরে ছয়টি মিল বন্ধ রয়েছে। সরকার সরবরাহ বাড়াতে আখের মূল্য বাড়িয়েছে। পাশাপাশি আগামী মৌসুম থেকে বন্ধ চিনিকলের মধ্যে কয়েকটি নতুন করে চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।’ তবে চিনি-বহির্ভূত পণ্যগুলো অধিক লাভজনক হওয়ায় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হচ্ছে বলেও জানান তিনি।